কুলাউড়াবিনোদনমৌলভীবাজার

সিনেমা’র অ্যাকশন দৃশ্য তৈরি করে ভাই’রাল কুলাউড়ার তরুণেরা

বিনোদন ডেস্কঃ সিলেটের কুলাউড়া উপজে’লার এই তরুণেরা মোবাইল দিয়ে তৈরি করছে তামিল, তেলুগুসহ দক্ষিণ ভা’রতের বিভিন্ন ইন্ডাস্ট্রির সিনেমা’র অ্যাকশন দৃশ্য। গ্রামে বসবাস করা এই তরুণরা শখের বসে এই ধরণের ভিডিও বানানো শুরু করলে তা দেখে আশেপাশের লোকজন বাহবা দিতে থাকে। ভিডিওগুলো দেখে বোঝার উপায় নেই এসব আনাড়ি হাতের কাজ। এদের কেউ সিনেমা’র ওপর কোনরকম প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেয়নি। তারপরেও তাদের তৈরি অ্যাকশন ভিডিওগুলো বাংলাদেশের বাণিজ্যিক সিনেমা’র থেকেও বহুলাংশে ভালো বলে মত দিয়েছেন অনেক নেটিজেন। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অনেকেই শেয়ার করছেন দক্ষিণী সিনেমা’র আদলে বানানো এই ভিডিওগুলো।

শর্ট অ্যাকশন ভিডিওর নির্মাতা তথা কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নিশান কুরাইশি জানান, “প্রায় দেড় বছর আগে আম’রা কয়েকজন বন্ধু ও এলাকার পরিচিত ছোটভাই মিলে এইরকম ভিডিও বানানোর সিদ্ধান্ত নিই। তামিল সিনেমা দেখতে ভালো লাগতো। বিশেষ করে ওদের ফাইটিং দৃশ্যগুলো অন্যসব সিনেমা’র থেকে বেশী আকর্ষণীয়। তামিল, তেলুগুর বিখ্যাত ও জনপ্রিয় সিনেমা, যেমন পুষ্পা, আর আর আর, কেজিএফের মতো সিনেমাগুলোতে দেখানো অ্যাকশন দৃশ্য আম’রা পুনরায় নিজেরা বানিয়ে থাকি। তারপর সেগুলোতে সিনেমা’র ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক ও মা’রামা’রির শব্দ যোগ করে দেই”।

নকল হাতিয়ারে দুর্দান্ত সব অ্যাকশন দৃশ্য

৫/৭ জন দৌড়ে আসছে বড় দা, হকিস্টিক আর লা’ঠিসোঁটা নিয়ে। যাকে উদ্দেশ্য করে মা’রতে এসেছিল, তার কাছেই সকলে মা’র খেয়ে চিতকাত হয়ে পড়ে গেছে। যেমনটি দেখানো হয় সিনেমাতে। মা’রামা’রির দৃশ্যে অ’ভিনয় করা এরা কেউ পেশাগত অ’ভিনেতা বা পরিচালক নয়। আর ভিডিওগুলো তে মা’রামা’রি করার জন্যে তারা যে হাতিয়ারগুলো ব্যবহার করছেন, তার কোনোটিই আসল নয়। দৃশ্যগুলো দেখে মনে হতে পারে মা’রামা’রি করতে গিয়ে তাদের শরীর থেকে র’ক্ত ঝরছে ও হাত-পা ভেঙ্গে গেছে। কিন্তু এগুলোর সবকিছুই নকল। খেলনা এই হাতিয়ারগুলো শুটিং-এর কাজ চালানোর জন্যে তারা নিজেদের মতো করে বানিয়ে নিয়েছেন।

তরুণদের এই দলটি নিজেদের পারদর্শিতা ও দক্ষতা দিয়ে মা’রামা’রির দৃশ্যগুলোকে সত্যি ঘটনার মতো ফুটিয়ে তুলেছে। দেখে বোঝার উপায় নেই, এগুলো বাংলাদেশের গ্রামের কয়েকজন তরুণের অ’ভিনয় করা ও মোবাইলে ধারণ করা। সাজ্জসজ্জা, শুটিং-এর স্থান ও মা’রামা’রি দেখে মনে হবে এগুলো দক্ষিণ ভা’রতীয় সিনেমা’র অ্যাকশন দৃশ্যের অংশ।

পেশাগত দক্ষতা না থেকেও নিপুণভাবে এই কাজটি করে যাচ্ছে সিলেটের কিছু তরুণ। সিলেটের বাসিন্দা বলে তাদের দলকে বাংলাদেশের অন্যরা ‘সিলেটি’ বলে ডাকে। কারণ মাদারীপুরের কয়েকজনও আছেন, যারা একই ধরনের অ্যাকশন ভিডিও করেন। সিলেটের ১৩-১৫ জনের এই দলের কেউ সিনেমা’র সাথে যু’ক্ত না থাকলেও; একেকজন দক্ষিণী সিনেমা’র ভক্ত।

নিশান কুরাইশি পুরো দলের নির্দেশনা ও ভিডিও এডিটিং-এর যাবতীয় কাজ করেন। আবার ক্যামেরার সামনে মূল চরিত্রেও থাকেন তিনি। তার নিজের নামে খোলা ইউটিউব চ্যানেলে ১০ হাজারের কাছাকাছি সাবস্ক্রাইবার রয়েছে। এটিই তাদের দলের অফিসিয়াল ইউটিউব চ্যানেল। একই নামে খোলা ফেসবুক পেজটিতে ২৬ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। ‘ব্ল্যাকবুক এন্টারটাইনমেন্ট’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে বাংলাদেশী ছে’লেদের তৈরি এ ধরণের অ্যাকশন ভিডিও নিয়মিত পোস্ট করা হয়। পেজটিতে লাখের ওপর ফলোয়ার থাকায় ভিডিওগুলো দ্রুত মানুষের কাছে পৌঁছে গেছে এবং হাজার হাজার লোক নিজেদের অ্যাকাউন্ট থেকে শেয়ার করেছেন। এভাবেই রাতারাতি মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে উঠেছে অ্যাকশন ভিডিও নির্মাণ করা এই তরুণরা।

আরিয়ান আকাশ নামের নিশান কুরাইশির দলের একজন সদস্য তাদের নকল হাতিয়ার স’ম্পর্কে জানান, “মা’রামা’রি করার সময় সিনেমাতে মাটি থেকে ধুলা উড়তে দেখা যায়। আম’রা এই কাজে সিমেন্ট ব্যবহার করি। সাধারণত ধুলা উড়লেও ভিডিও-তে এতো বোঝা যায় না। তাই মাটিতে পরে যাওয়ার দৃশ্যে এবং সেখান থেকে উঠে দাঁড়ানোর পর জামাকাপড়ে সিমেন্ট লাগিয়ে দেওয়া হয়। সিমেন্ট কে ধুলার মতো ছড়িয়ে দেওয়ার জন্যে পাশ থেকে কার্টন কাগজ দিয়ে বাতাস দেওয়া হয়। আ’হত হয়ে র’ক্ত বের হচ্ছে বোঝাতে আলতা ব্যবহার করা হয়। আর মা’রামা’রি করার জন্যে চাইনিজ কুড়াল, হকিস্টিক, ছু’রি ও গাছের তৈরি মোটা লা’ঠি ব্যবহার করা হয়। এগুলোর বেশিরভাগই নকল অ’স্ত্র, যেগুলোতে তেমন ধার নেই। ক্লোজআপ শট অর্থাৎ যখন কাছ থেকে ক্যামেরা করা হয়, তখন আসল হাতিয়ার রাখা হয়”।

‘ফ্রেন্ডস ফরেভা’র’ দলের মূল নির্দেশক সুফিয়ান খান মাহবুব ও তার দলের সদস্যরা মাদারীপুর জে’লার কালকিনি উপজে’লার ‘সমিতির হাট’ নামক গ্রাম ও তার আশেপাশে বাস করেন। সেখান থেকেই তারা অ্যাকশন ভিডিওর শুটিং শুরু করেছিলেন। পলিটেকনিকে পড়াশোনার পাশাপাশি সুফিয়ান অ্যাকশন ভিডিওর কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। শুরু থেকে তার বেশিরভাগ ভিডিওর শুট করা হয়েছে নিজ গ্রামে। কিন্তু পড়াশোনার জন্য বর্তমানে তিনি ঢাকায় অবস্থান করছেন এবং পরবর্তী কিছু ভিডিও তিনি ঢাকায় শুট করেছেন। সুফিয়ানের দলের সদস্যদের মধ্যে ৬ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। যাদের বেশিরভাগ স্কুল, কলেজে পড়াশোনা করছেন।

নিশান কুরাইশী ও তার দলের সদস্যরা সিলেট বিভাগের মৌলভীবাজার জে’লার কুলাউড়া শহরে বাস করে। জয়পাশা নামক শহরের ছোট একটি এলাকা ও এর আশপাশেই দলের সদস্যরা থাকেন। তবে ভিডিও করার জন্য তারা ছুটে যান শহরের আশপাশের গ্রামগুলোতে। সিনেমা’র অ্যাকশন দৃশ্যের সঙ্গে মিল রাখতে বেছে নিতে হয় গ্রামীণ ও গাছগাছালি আছে এমন পরিবেশ।

সদস্যদের বেশিরভাগ পড়াশোনার ইতি টেনেছেন মাঝপথ থেকে। কেউ কেউ উচ্চ’মাধ্যমিক ও মাধ্যমিকের গন্ডি পেরিয়ে কাজে লেগে পড়েছেন।

নিশান কুরাইশী উচ্চ’মাধ্যমিকের পর আর পড়াশোনা করেননি। একটি প্রতিষ্ঠানে মোবাইলের হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যারের কাজে নিযু’ক্ত আছেন তিনি। দলের আরেক সদস্য আরিয়ান আকাশের এলাকায় ছোট্ট একটি মোবাইলের দোকান রয়েছে।

প্রতিভা থাকলে কম বাজেটেই সেরা সিনেমা সম্ভব

“আমাদের দেশে এতো এতো বিশাল বাজেটের সিনেমা বানানো হয়, কিন্তু অ্যাকশন দেখলে মনে হবে এগুলো একেবারেই নিম্নমানের। দুম’দাম সাউন্ড দিয়ে দিলেই অ্যাকশন হয়ে যায় না। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও আশেপাশের পরিচিতদের অনেকেই বলেছেন, আমাদের অ্যাকশন ভিডিও বাংলাদেশে তৈরি হওয়া সিনেমা’র থেকেও ভালো হয়। প্রথম’দিকে ভিডিও ধারণ থেকে এডিট সবকিছুই মোবাইল ব্যবহার করে করা হতো। প্রতিটি ভিডিও শুট করতে আমাদের ৪/৫ ঘণ্টা লেগে যায়। আর ২ মিনিটের একটি অ্যাকশন ভিডিও এডিট করতে প্রায় ২ দিন সময় লাগে। কারণ এগুলো তে স্লো মোশন, ইফেক্ট, ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিকসহ আরও বিভিন্ন কাজ করতে হয়। কিন্তু আমাদের দেশে নির্মিত সিনেমাগুলো তে বেশী সময় নিয়ে এসব কাজ করা হয় না। অনেক সময় পরিকল্পনার অভাব থাকে, যা সিনেমা’র অ্যাকশন দৃশ্যগুলো দেখলেই বোঝা যায়। তাইতো বিগ বাজেট, এতো নামী-দামী ক্যামেরা ও উন্নত সব প্রযু’ক্তি থাকার পরেও আমাদের বাংলা সিনেমা’র মান এখনো আগের মতোই রয়ে গেছে। অনেকেই মনে করে অনেক বাজেট ছাড়া ভালো অ্যাকশন সিনেমা তৈরি করা সম্ভব না। এই ধারণা কে আম’রা ভুল প্রমাণ করে দিতে পেরেছি”, একটানে কথাগুলো বলছিলেন নিশান।

কোনো বাজেট ছাড়া শখের বশে অ্যাকশন ভিডিও বানানো এই তরুণদের প্রায় ২ বছর পেরিয়ে গেলেও ভিডিও থেকে এখনও কোনো উপার্জন করতে পারেনি। অন্য পেজ থেকে তাদের নির্মিত ভিডিওগুলো আপলোড করে মিলিয়ন ভিউ হওয়ার পরেও- সেখান থেকে কোনোপ্রকার অর্থ পায়নি এই তরুণরা। তবুও তারা নিজেদের কপিরাইট দাবির চেয়ে মানুষের কাছে পরিচিতি পাওয়ার জন্যে বেশি আগ্রহী। মা’রামা’রির দৃশ্য করতে গিয়ে এদের অনেকেই হাত-পায়ে প্রায়সময় আ’ঘাত ও চোট পেয়ে থাকে। তবুও শখের এই কাজ থেকে সরে যায়নি। তাদের বিশ্বা’স তারা একদিন ভালো মানের অ্যাকশন দৃশ্যে নেতৃত্ব দিবে। বাংলাদেশের সিনেমায় কাজ করার ডাক পাবে।

নিশান কুরাইশি আরও বলেন, “মা’রামা’রির করতে গিয়ে একটু আধটু আ’ঘাত আমাদের পেতে হয়। তারপর কিছুদিন বিশ্রাম নিলে ঠিক হয়ে যায়। মাঝেমধ্যে হাত-পা কে’টে গেলে ডাক্তারের কাছে গিয়ে ব্যান্ডেজ করে আসতে হয়। জানেন তো ‘নো পেইন, নো গেইন’। তাই ব্যথা পেলেও এই কাজটা করতে আম’রা আনন্দ পাই। কয়েকদিন আগে আমাদের ইউটিউব চ্যানেলে ওয়াচ টাইম পূরণ হয়েছে। কপিরাইট স্ট্রাইক এড়াতে ইউটিউবে যে মিউজিক পাওয়া যায় ওগুলো ব্যবহার করা হয়। প্রতিটি সিনেমা’র ক্ষেত্রে ইউটিউবে কিছু ফ্রি মিউজিক পাওয়া যায়। তাই ভিডিও’র ব্যাকগ্রাউন্ডে ওগুলো ব্যবহার করলে চ্যানেল ডাউন হওয়ার সম্ভাবনা থাকে না”।

মাদারীপুরের সুফিয়ান খান মাহমুব দক্ষিণী সিনেমা’র আদলে একইরকম স্বল্প দৈর্ঘ্যের অ্যাকশন ভিডিও বানান। ১০/১২ জন নিয়ে গঠিত তাদের দলের নাম ‘ফ্রেন্ডস ফরেভা’র’। এই দলের বেশিরভাগ সদস্য স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী। করো’নাকালীন সময়ে স্কুল বন্ধ থাকায় বন্ধুরা মিলে দক্ষিণী সিনেমা’র মা’রামা’রি দেখে ভিডিও বানানো শুরু করেন। তারাও শুরুতে মোবাইল দিয়েই ভিডিও ধারণ ও এডিটের কাজ করতেন। তারপর নিজেদের তৈরি করা ভিডিও থেকে উপার্জন আসতে শুরু করলে তা দিয়ে ক্যামেরা ও ল্যাপটপ কিনে নেয়।

এই কন্টেন্ট ক্রিয়েটর নিজের কাজ নিয়ে জানান, “১টা ক্যামেরায় শুট করা হয় বিধায় বারবার এঙ্গেল পরিবর্তন করতে হয়। আর এভাবে কাজ করতে গিয়ে ২ দিনের মতো সময় দিতে হয় শুটিং-এর পেছনে। তারপর সেটা এডিট করতে আরও ২/৩ দিন তো লাগেই। তাই অ্যাকশন দৃশ্যের ভিডিওগুলো ছোট হলেও-এটা করতে আমাদের প্রায় ১ সপ্তাহ সময় লেগে যায়। মাদারীপুরে বসে আম’রা নিজ থেকে অ্যাকশন ও এডিটের সবকিছু শিখতে পারলে-আমাদের দেশের বড় বড় অ্যাকশন পরিচালকরা কেন পারছেন না, তা হয়তো অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে। তাই আম’রা যদি সঠিক নির্দেশনা ও অর্থ সহায়তা পাই তাহলে ভালো অ্যাকশন সিনেমা বানাতে পারবো বলে মনে করি”।

সুফিয়ানের মতো নিশান কুরাইশি ও তার দলের সদস্যদের ইচ্ছে তারাও একদিন বড় পর্দায় দিক নির্দেশনার কাজের জন্যে ডাক পাবে। সেদিন হয়তো গ্রামের গন্ডি পেরিয়ে এই তরুণেরা নিজেদের প্রতিভা সকলের কাছে তুলে ধরতে পারবে। ভিডিও নির্মাণ করা এই তরুণদের বিশ্বা’স, ভালো মানের অ্যাকশন দৃশ্যের জন্যে প্রচুর অর্থের দরকার পরে না। প্রয়োজন ব্যক্তির প্রতিভা ও ভালো মানের কাজ উপহার দেওয়ার ইচ্ছা। তাইতো ভবিষ্যতে বাণিজ্যিক সিনেমায় কাজ করার স্বপ্ন দেখেন এই তরুণেরা।

Back to top button
error: Alert: Content is protected !!